উমরাহ ও হজ্জ আদায়ের সময় প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট কিছু দোয়া পড়া সুন্নত ও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। ইহরাম বাঁধার সময় “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা উমরাতান” বলে নিয়ত করা হয় এবং এরপর থেকে তাওয়াফ শুরু হওয়া পর্যন্ত তালবিয়াহ দোয়া বেশি বেশি পড়তে হয়।
মসজিদুল হারাম প্রবেশের সময় রহমতের দরজা খোলার দোয়া পড়া সুন্নত। তাওয়াফের সময় নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বাধ্যতামূলক নয়, তবে “রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ…” দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পড়া হয়। তাওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহিমে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা হয়।
সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করার সময় আল্লাহর প্রশংসা ও নিজের ভাষায় দোয়া করা উত্তম। উমরাহ শেষে মাথা মুন্ডানো বা চুল কাটার মাধ্যমে ইহরাম শেষ হয়। হজ্জের ক্ষেত্রে আরাফার ময়দানে দোয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কবুলের সর্বোচ্চ সময় হিসেবে গণ্য হয়।
মদিনা শরীফ এ গিয়ে নবীজি ﷺ-এর রওজার সামনে দরুদ ও সালাম পেশ করা হয়। দোয়া মুখস্থ না থাকলেও নিজের ভাষায় বিনয়ের সাথে চাওয়া সম্পূর্ণ বৈধ এবং অধিক ফজিলতপূর্ণ।
উমরাহ ও হজ্জ ইসলামের এমন দুটি ইবাদত, যেখানে প্রতিটি ধাপেই দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। সঠিক সময়ে সঠিক দোয়া জানা থাকলে ইবাদত হয় আরও গভীর, অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য—ইনশাআল্লাহ। অনেকেই প্রথমবার উমরাহ বা হজ্জে গেলে বুঝতে পারেন না কোন সময় কোন দোয়া পড়তে হবে।
ইহরাম বাঁধার নিয়ত ও দোয়া
উমরাহ বা হজ্জের প্রথম ধাপ হলো ইহরাম বাঁধা। ইহরাম বাঁধার পর নিয়ত করা ফরজ।
আরবি:
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ عُمْرَةً
উচ্চারণ:
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা উমরাতান
অর্থ:
হে আল্লাহ! আমি উমরাহ করার নিয়ত করলাম।
তালবিয়াহ দোয়া (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
ইহরাম বাঁধার পর থেকে তাওয়াফ শুরু হওয়া পর্যন্ত বেশি বেশি তালবিয়াহ পড়তে হয়।
আরবি:
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
উচ্চারণ:
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক… (সম্পূর্ণ)
অর্থ:
আমি হাজির, হে আল্লাহ! আপনার কোনো শরিক নেই। সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব একমাত্র আপনার।
মসজিদুল হারাম প্রবেশের দোয়া
আরবি:
اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মাফতাহ লি আবওয়াবা রহমাতিক
অর্থ:
হে আল্লাহ! আপনার রহমতের দরজাগুলো আমার জন্য খুলে দিন।
তাওয়াফের সময় পড়ার দোয়া
তাওয়াফের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে হজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে এই দোয়াটি বেশি পড়া হয়।
রুকনে ইয়ামানি ও হজরে আসওয়াদের মাঝের দোয়া
আরবি:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ:
রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ…
অর্থ:
হে আমাদের পালনকর্তা! দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করুন।
মাকামে ইবরাহিমে দোয়া
তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা সুন্নত।
দোয়া (সাজদায়):
হে আল্লাহ! আমার গুনাহ মাফ করে দিন, আমার ইবাদত কবুল করুন।
সাফা ও মারওয়াতে সাঈর দোয়া
আরবি:
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ
অর্থ:
নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।
এখানে হাত তুলে নিজের ভাষায় দোয়া করা সুন্নত।
মাথা মুন্ডানো বা চুল কাটার দোয়া
আরবি:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْمُحَلِّقِينَ
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মাগফির লিল মুহাল্লিকীন
অর্থ:
হে আল্লাহ! যারা মাথা মুন্ডন করে, তাদের ক্ষমা করুন।
মদিনা শরীফ যাওয়ার দোয়া
আরবি:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ
নবীজি ﷺ-এর রওজার সামনে শান্তভাবে দরুদ ও দোয়া করা উত্তম।
হজ্জের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া (আরাফার ময়দান)
আরবি:
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ
অর্থ:
আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক।
আরাফার দিনে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
সাধারণ কিন্তু শক্তিশালী দোয়াগুলো
-
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
👉 হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন -
اللَّهُمَّ اهْدِنِي
👉 হে আল্লাহ! আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন -
اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنِّي
👉 হে আল্লাহ! আমার ইবাদত কবুল করুন
উমরাহ ও হজ্জের দোয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ টিপস
-
মুখস্থ না পারলে নিজের ভাষায় দোয়া করা জায়েজ
-
কান্না, বিনয় ও মনোযোগ দোয়ার শক্তি বাড়ায়
-
অন্যের জন্য দোয়া করলে ফেরেশতা “আমিন” বলে
উমরাহ ও হজ্জের দোয়া শুধু মুখে পড়ার জন্য নয়—বরং হৃদয় দিয়ে চাওয়ার মাধ্যম। এই গাইডে উল্লেখিত দোয়াগুলো মনে রাখলে তোমার ইবাদত হবে আরও সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে বারবার তাঁর ঘরে ডাকার তাওফিক দেন—আমিন।
FAQ: উমরাহ ও হজ্জের দোয়া
❓ উমরাহ করার সময় কি নির্দিষ্ট দোয়া মুখস্থ করা বাধ্যতামূলক?
না, উমরাহ করার সময় দোয়া মুখস্থ করা বাধ্যতামূলক নয়। কুরআন বা হাদিসে এমন কোনো শর্ত নেই। নিজের ভাষায় মন থেকে দোয়া করাও সম্পূর্ণ বৈধ ও উত্তম।
❓ তাওয়াফের সময় কোন দোয়া পড়া সবচেয়ে উত্তম?
তাওয়াফের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে রুকনে ইয়ামানি ও হজরে আসওয়াদের মাঝখানে
“রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ…”
এই দোয়াটি বেশি পড়া সুন্নত।
❓ দোয়া ভুল হলে কি উমরাহ বা হজ্জ বাতিল হয়ে যায়?
না, দোয়া ভুল হলে উমরাহ বা হজ্জ বাতিল হয় না। দোয়া ইবাদতের সৌন্দর্য বাড়ায়, কিন্তু উমরাহ বা হজ্জের ফরজ ও ওয়াজিব আদায় ঠিক থাকলে ইবাদত সহিহ থাকে।
❓ নিজের ভাষায় দোয়া করলে কি সওয়াব কম হয়?
না, নিজের ভাষায় দোয়া করলে সওয়াব কম হয় না। বরং হৃদয় থেকে বোঝা ভাষায় দোয়া করলে একাগ্রতা ও বিনয় বাড়ে, যা দোয়া কবুলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
❓ হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কবুল দোয়ার সময় কখন?
হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কবুল দোয়ার সময় হলো আরাফার দিন, বিশেষ করে যোহর ও মাগরিবের মাঝের সময়। এই সময় বেশি বেশি দোয়া, তাওবা ও ইস্তিগফার করা উত্তম।
❓ উমরাহ বা হজ্জে কি ছোট দোয়া পড়লেও যথেষ্ট?
হ্যাঁ, ছোট দোয়া হলেও যথেষ্ট। যেমন—
“আল্লাহুম্মাগফিরলি”,
“আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নি”
এই দোয়াগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও অত্যন্ত শক্তিশালী।
❓ মদিনায় গিয়ে কি আলাদা কোনো দোয়া পড়তে হয়?
মদিনায় গিয়ে নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক দোয়া নেই। নবীজি ﷺ-এর রওজার সামনে শান্তভাবে দরুদ ও সালাম পেশ করা এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী দোয়া করা উত্তম।
❓ উমরাহ ও হজ্জের দোয়া বই বা মোবাইল দেখে পড়া যাবে কি?
হ্যাঁ, দোয়া বই বা মোবাইল দেখে পড়া সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে কোনো সমস্যা নেই, বিশেষ করে যারা দোয়া মুখস্থ জানেন না তাদের জন্য এটি সহায়ক।





